Health

কিডনি নষ্টের লক্ষণ এই ১০টি আগে জানলে বাঁচতে পারেন মারাত্মক বিপদ হতে

কিডনি নষ্টের লক্ষণ
এই ১০টি লক্ষণ জানলে বাঁচতে পারেন মারাত্মক বিপদ হতে

কিডনির রোগ খুবই মারাত্মক। এটি মানুষকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এই রোগ থেকে দূরে থাকা উচিৎ। তবে যদি এই রোগ একবার হয়ে যায় তখন দূরে থাকা প্রায় অসম্ভব। – কিডনি নষ্টের লক্ষণ

তবে কিডনি নষ্টের লক্ষণ যদি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায় তাহলে অনেক সময়ই প্রতিকার সম্ভব। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে গেলে আপনাকে অবশ্যই এর লক্ষণ ও প্রতিকার সম্বন্ধে জানা আবশ্যক। আসুন জেনে নিই কিভাবে এটির লক্ষণ বুঝবেন ও এর প্রতিকার করবেন।

কিডনি

আমাদের দেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হল কিডনি। প্রত্যেক মানুষের দেহে দুইটি কিডনি রয়েছে। দেখতে সাধারণত কলাই আকৃতির হয় এটি। কিডনি দুটি দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৯ থেকে১২ সেন্টিমিটার হয় এবং প্রস্থে ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার হয়। এছাড়া এরা ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার মোটা হয়। এটি মেরুদন্ডের দুই পাশে অবস্থান করে। কোমড় থেকে একটু উপরেই এদের অবস্থান।

কিডনি নষ্টের লক্ষণ

লক্ষণ না জানার জন্য অনেকেই বুঝেননা যে তার কিডনি রোগ আছে। রোগটি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা রোগটি নিরাময়ের মূল শক্তি। কিডনি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়।

কিডনি রোগের উপসর্গ গুলোর সাথে অন্য স্বাস্থ্য সমস্যার উপসর্গের মিল আছে। কিডনি নষ্টের লক্ষণ গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা থাকলে সেই অনুযায়ী নিরাময়ের ব্যবস্থা নেয়াও সহজ হয়। আপনার নিজের বা পরিচিত কারো যদি কিডনি রোগের এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে তাঁর কিডনির সমস্যা আছে কিনা। আজকে আমরা ১০ টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নিব।

১। ঘন ঘন মূত্রত্যাগ বা প্রস্রাবের বেগ হওয়া 

যদি কারও প্রায়ই বিশেষ করে রাতের বেলায় ঘন ঘন মূত্রত্যাগ বা প্রস্রাবের বেগ হয় তাহলে এটা কিডনি রোগের লক্ষণ। কিডনির ছাঁকনি গুলো নষ্ট হয়ে গেলে প্রস্রাবের বেগ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ঘন ঘন মূত্রত্যাগ ইউরিন ইনফেকশনেরও পূর্ব লক্ষণ। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্লেন্ড বড় হয়ে গেলেও এ ধরনের  উপসর্গ দেখা দিতে পারে।  

২। চোখের চারপাশে ফুলে যাওয়া

কারও কিডনি যদি অনেক বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে প্রস্রাবের সাথে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন বের হতে পারে। এর ফলে তাঁর চোখের চারপাশে ফুলে যেতে পারে।   

৩। পায়ের পাতা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া  

কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ রোগীর পায়ের পাতা এবং গোড়ালি ফুলে যায়। এই পায়ের নীচের অংশ ফুলে যাওয়া হৃদরোগ ও লিভারের জটিলতা নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি করতে পারে।  

৪। শরীরের চামড়া শুষ্ক ও ফেটে যাওয়া

কিডনি সুস্থ অবস্থায় অনেক গুরুত্ব পূর্ণ কাজ করে যেমন শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল বাহির করা, লাল রক্ত কণিকা তৈরি করা, হাড়কে শক্তিশালী করা,দেহে খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষা করা ইত্যাদি। কিডনি যখন রক্তের পুষ্টি উপাদান ও খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনা তখন শরীরের চামড়া শুষ্ক ও ফেটে যেতে পারে যা অ্যাডভান্স কিডনি রোগের সাথে সম্পর্কিত।

৫। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া

কিডনি সুস্থ অবস্থায় রক্ত কণিকাগুলোকে শরীরের ভিতরে ছেঁকে রেখে বর্জ্য পদার্থ মূত্র হিসেবে বের করে দেয়। যদি কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে প্রস্রাবের সাথে রক্ত কণিকা বের হতে শুরু করে। ফলে প্রস্রাবের সাথে রক্ত যেতে পারে। রক্ত যাওয়ার এই লক্ষণ কিডনি রোগের সাথে সাথে টিউমার, কিডনি পাথর বা ইনফেকশনেরও ইঙ্গিত বহন করে।  

৬। প্রস্রাবে বেশি ফেনা দেখা দেয়া

প্রস্রাবে অনেক বেশি ফেনা দেখা দিলে বুঝতে হবে যে, প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন জাতীয় পদার্থ যাচ্ছে। ডিমের সাদা অংশ ফাটানো হলে যেমন ফেনা হয় প্রস্রাবের এই বুদবুদ ও ঠিক সেই রকম। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নামক প্রোটিনের উপস্থিতির জন্য এমনটি হয়। কিডনির ফিল্টার ড্যামেজ হয়ে গেলে প্রোটিন জাতীয় পদার্থ লিক হয়ে প্রস্রাবের সাথে বের হতে থাকে। এর ফলে প্রস্রাবে ফেনা দেখা দেয়। 

৭। অনেক বেশি ক্লান্ত ও শক্তিহীন অনুভব করা

কিডনির কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেলে রক্তে অপদ্রব্য হিসেবে টক্সিন তৈরি হয়। এজন্য দুর্বল ও ক্লান্ত লাগার পাশাপাশি যে কোন বিষয়ে মনোযোগ দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে  শরীরে অন্য জটিলতা, যেমন রক্তশূন্যতা বা এনেমিয়াও দেখা দিতে পারে।  আর এই রক্তস্বল্পতার কারণেও দুর্বলতা বা অবসাদ গ্রস্থতার সৃষ্টি হতে পারে।  

৮। নিদ্রাহীনতা বা ঘুমের সমস্যা হওয়া

যদি কিডনি রক্ত পরিশোধন ঠিক মতো না করতে পারে তাহলে রক্তের টক্সিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হতে পারেনা। এর ফলে বিষাক্ত টক্সিন রক্তেই থেকে যায়। এর ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই অতিমাত্রায় নিদ্রাহীনতা ক্রনিক কিডনি ডিজিজের উপসর্গ হতে পারে। এছাড়া অবেসিটি বা স্থূলতারসাথেও ক্রনিক কিডনি রোগের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

৯। অতিমাত্রায় ক্ষুধা কমে যাওয়া

শরীরে টক্সিনের উৎপাদন বেড়ে গেলে কিডনির কার্যকারিতা কমে যায়। এর ফলে রোগীর ক্ষুধার পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

১০। মাংসপেশীতে খিঁচুনি হওয়া

কিডনির কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের যেমন- ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা কমে গেলে দেহে এসব উপাদানের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এই ভারসাম্যহীনতার জন্য মাংসপেশিতে খিল লাগা বা খিঁচুনি জাতীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও বমি বমি ভাব, নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হওয়া, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, সব সময় ঠান্ডা অনুভব করা, মাথা ঘোরা, কোমর ও পায়ে ব্যাথা হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ গুলোও দেখা দিতে পারে।

পেইন কিলার খেলে লিভার-কিডনিসহ্ শরীরের যেসব ক্ষতি করে

কিডনি ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাই এই গুরুত্বপুর্ন অঙ্গটি যদি ঠিকমতো কাজ না করে তাহলে তা আমাদের জন্য মহাবিপদ। তাই সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে লাইফস্টাইল বদলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে চললে কিডনি বিকল হওয়ার মতো বিষয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কিডনি রোগ প্রতিরোধের/প্রতিকারের উপায়

কিডনির রোগ বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশেও এই রোগ প্রকট হয়ে উঠছে। কিন্তু আমাদের দেশে দারিদ্র্যতা ও নানা কারণে এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব না। তাই এ রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের দিকেই আমাদের নজর দেওয়া উচিৎ। কিডনি রোগ প্রতিরোধের কিছু উপায় হল:

  • নিয়মিত ব্যায়াম ও দৈহিক পরিশ্রম করা।
  • নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা।
  • ধূমপান থেকে বিরত থাকা।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো রোগের ওষুধ সেবন না করা।
  • এ সকল নিয়ম মেনে চললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিডনির রোগ হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

কিডনি ভালো রাখার উপায়

কিডনি ভালো রাখতে শরীরে ফ্লুয়িড ব্যালেন্স ঠিক রাখা জরুরী। কিডনি ভালো রাখতে নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। এছাড়া কিডনি ভালো রাখার একটি অন্যতম উপায় হল বেশি পরিমাণে পানি পান করা। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।

চর্ম রোগ (ত্বকের রোগ) কি? কেনো হয়? চর্ম রোগ হলে করনীয় কী?

নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে কিডনি সুস্থ থাকে। কিডনিকে ভালো রাখতে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সকল প্রকার শারীরিক নিয়ম মেনে চললে খুব সহজেই কিডনি ভালো রাখা সম্ভব। পাশাপাশি কোনো রোগ হলে সে রোগের ঔষধ গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। কারণ বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া থেকেও কিডনির রোগ হয়।

পরিশেষে-

কিডনির রোগ হলে তার চিকিৎসা করানো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। তাই কিডনির রোগের চিকিৎসা করানোর চেয়ে এই রোগ প্রতিরোধে আগে থেকেই নিয়ম মেনে চলা ও সতর্ক থাকাই উত্তম। তাই কিডনির রোগ এড়াতে নিয়ম মেনে চলা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চলা অত্যাবশ্যক। নিয়ম মেনে চললে শুধু কিডনির রোগই নয়, অন্য রোগ থেকেও সুস্থ থাকা সম্ভব।

– তথ্য সংগৃহীত

Leave a Comment